Thursday, 24 September 2026

বেদের অংশ সমূহ | ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ব বেদ।।ancient indian history veda notes in bengali

বেদের অংশ সমূহ | ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ব বেদ।।ancient indian history veda notes in bengali বেদের অংশ সমূহ | ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ব বেদ

বেদের অংশ সমূহ | ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ব বেদ

✍️ লেখক: SAYAN SHEET 📅 সর্বশেষ আপডেট: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ 📂 বিভাগ: প্রাচীন ভারতের ইতিহাস

📌 একনজরে সারসংক্ষেপ

প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস ও সনাতন ধর্মের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ হলো 'বেদ'। এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার মূলত চারটি অংশে বিভক্ত, যা বেদের অংশসমূহ নামে পরিচিত। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস সংকলিত এই চার বেদ হলো: ঋগ্বেদ (দেবস্তুতি ও প্রাচীনতম পাঠ), সামবেদ (সঙ্গীত ও সুরের আদি উৎস), যজুর্বেদ (যজ্ঞের ক্রিয়াকাণ্ড ও নিয়ম) এবং অথর্ববেদ (চিকিৎসাবিদ্যা ও তন্ত্রমন্ত্র)। ঋগ, সাম ও যজুর্বেদকে একত্রে 'বেদত্রয়ী' বলা হয়।

ভূমিকা: বেদ ও বৈদিক সাহিত্য

হিন্দু ধর্মের প্রাচীনতম, পবিত্রতম এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ হলো 'বেদ'। সংস্কৃত 'বিদ' ধাতু থেকে বেদ শব্দটির উৎপত্তি, যার অর্থ হলো 'জ্ঞান'। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী বেদ কোনো সাধারণ মানুষের রচনা নয়, এটি 'অপৌরষেয়' অর্থাৎ ঈশ্বরের মুখনিঃসৃত বাণী।

প্রাচীনকালের ঋষিরা গভীর ধ্যানের মাধ্যমে এই মহাজাগতিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন এবং তা শ্রুতির মাধ্যমে (শুনে শুনে) শিষ্যপরম্পরায় সংরক্ষণ করেছিলেন। তাই বেদের অপর নাম 'শ্রুতি'। কালক্রমে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডারকে বিষয়বস্তু অনুযায়ী চারটি মূল ভাগে বিভক্ত করেন। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক ইতিহাস পুনর্গঠনে বৈদিক সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম।

১. ঋগ্বেদ (Rigveda)

প্রাচীনতম বেদ

দেবস্তুতি ও প্রাচীনতম পাঠ

সমগ্র বিশ্বের সাপেক্ষে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর প্রাচীনতম সাহিত্য হলো ঋগ্বেদ। সনাতন ধর্মের প্রধান চারটি গ্রন্থের মধ্যে এটি প্রাচীনতম ও সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ।

  • গঠন: এতে মোট ১০টি মণ্ডল, ১০২৮টি সূক্ত (১০১৭টি মূল + ১১টি বালখিল্য সূক্ত) এবং ১০,৫৮০টি ঋক (শ্লোক) রয়েছে। সম্পূর্ণ গ্রন্থটি ৮টি 'অষ্টক'-এ বিভক্ত এবং প্রতিটি অষ্টকে ৮টি করে অধ্যায় রয়েছে।
  • প্রাচীনতম মণ্ডল: ২য় থেকে ৭ম মণ্ডল সবচেয়ে প্রাচীন, যেগুলোকে 'কুলগ্রন্থ' (Family Books) বলা হয়। এগুলো বিভিন্ন ঋষি বংশের দ্বারা রচিত। ১ম এবং ১০ম মণ্ডল সবচেয়ে শেষে সংযোজিত হয়।
  • দেবতাদের স্তুতি: ইন্দ্র (২৫০টি সূক্ত), অগ্নি (২০০টি সূক্ত), বরুণ ও মিত্রের উদ্দেশ্যে স্তুতিগান রচিত। ঋগ্বেদে সবচেয়ে বেশি উল্লেখিত নদী সিন্ধু এবং সবচেয়ে পবিত্র নদী সরস্বতী (নদীতমা)
  • গায়ত্রী মন্ত্র: বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্র ঋগ্বেদের ৩য় মণ্ডলে স্থান পেয়েছে, যা ঋষি বিশ্বামিত্র সূর্যদেবী সাবিত্রীর উদ্দেশ্যে রচনা করেছিলেন।
  • দশরাজন যুদ্ধ (Battle of Ten Kings): ঋগ্বেদের ৭ম মণ্ডলে রাভী (পরুষ্ণী) নদীর তীরে ভরত গোষ্ঠীর রাজা সুদাস ও দশ রাজার কনফেডারেশনের ঐতিহাসিক যুদ্ধের বিবরণ রয়েছে।
  • পুরুষসূক্ত ও বর্ণপ্রথা: ঋগ্বেদের ১০ম মণ্ডলের 'পুরুষসূক্তে' সর্বপ্রথম সমাজকে চার বর্ণে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) বিভাজনের স্পষ্ট উল্লেখ মেলে।
  • পুরোহিত: প্রাচীন যুগে যেসব মুনি-ঋষি ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলো আবৃত্তি করতেন, তাঁদেরকে হোত্রী (Hotri) বলা হতো। এই প্রাচীনত্বের কারণেই একে "মানব জাতির আদি আইন" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।

২. সামবেদ (Samaveda)

সঙ্গীত ও সুর

ভারতীয় সঙ্গীতের আদি উৎস

সামবেদকে মূলত 'মন্ত্রবেদ' বা মন্ত্রজ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রাচীনকালে এর নাম ছিল 'সমন', যার আভিধানিক অর্থ হলো সুর বা মেলোডি।

  • শ্লোক সংখ্যা: এতে মোট ১৮৭৫টি শ্লোক রয়েছে। এর প্রায় সমস্ত শ্লোকই (মাত্র ৭৫ থেকে ৯৯টি বাদে) ঋগ্বেদের ৮ম ও ৯ম মণ্ডল থেকে সংগৃহীত।
  • সঙ্গীতের আদি উৎস: ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত (Classical Music) এবং শাস্ত্রীয় নৃত্যের উৎপত্তি এই সামবেদ থেকেই হয়েছে। ভারতীয় সঙ্গীতের সপ্তস্বর (সা, রে, গা, মা, পা, ধা, নি) প্রথম সামবেদেই উল্লেখিত হয়।
  • সামগান: যজ্ঞের সময় সুর করে যে স্তোত্রগুলো গাওয়া হতো, সেগুলোকে 'সামগান' বলা হতো।
  • পুরোহিত: সামবেদের মন্ত্র আবৃত্তিকারক পুরোহিতকে উদ্গাতা (Udgatri) বলা হয়।
  • সময়কাল: আনুমানিক ১২০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এটি সংকলিত হয়েছিল।

৩. যজুর্বেদ (Yajurveda)

যজ্ঞ ও নিয়ম

কৃষ্ণ ও শুক্ল শাখা

যজুর্বেদ রচনার সময়কালও আনুমানিক ১২০০ থেকে ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। 'যজুঃ' শব্দটির অন্তর্নিহিত অর্থ হলো— শ্রদ্ধা নিবেদন, পূজা, ধর্মানুশীলন এবং যজ্ঞের সময় পঠিত বিশেষ মন্ত্র বা প্রার্থনা পদ্ধতি। প্রাচীনকালে এই বেদটি 'যজুমষি' নামে পরিচিত ছিল।

বিশেষত্ব: যজুর্বেদ একমাত্র বেদ যা পদ্য ও গদ্য উভয় রীতিতেই রচিত

১. শুক্ল যজুর্বেদ (বাজসনেয়ী সংহিতা): এটি কেবল মূল বৈদিক মন্ত্রের সুবিন্যস্ত রূপ।
২. কৃষ্ণ যজুর্বেদ (তৈত্তিরীয় সংহিতা): এতে মন্ত্রের সাথে সাথে গদ্যে যজ্ঞের ব্যাখ্যামূলক অংশ যুক্ত থাকায় এটি কিছুটা অগোছালো।
  • পুরোহিত: যজ্ঞ সম্পন্ন করার সময় যজুর্বেদের নির্দেশ ও মন্ত্র পাঠকারী পুরোহিতকে অধ্বর্যু (Adhvaryu) বলা হতো।
  • গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ: প্রাচীন ভারতের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক ও সামাজিক দলিলের উৎস বিখ্যাত 'শতপথ ব্রাহ্মণ' শুক্ল যজুর্বেদেরই একটি অংশ।

৪. অথর্ববেদ (Atharvaveda)

চিকিৎসা ও মন্ত্র

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সমাজ

খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ থেকে ১০০০ অব্দের সমসাময়িক সময়ে রচিত অথর্ববেদ দীর্ঘকাল 'বেদত্রয়ী'-র বাইরে ছিল। ঋষি অথর্বা ও অঙ্গিরসের নামানুসারে শুরুতে এর নামকরণ করা হয়েছিল 'অথর্বাঙ্গিরস'।

  • বিষয়বস্তু: এতে রয়েছে ভেষজ চিকিৎসাবিদ্যা, রোগ নিরাময়, যাদুবিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র, অভিশাপ, বশীকরণ এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রার্থনাসমূহ।
  • বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: একে প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা এবং গাছগাছড়া সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রথম লিখিত দলিল বলে মনে করা হয়।
  • পুরোহিত: অথর্ববেদের মন্ত্র পরিচালনকারী বা মূল তত্ত্বাবধায়ক পুরোহিতকে ব্রহ্মা (Brahma) বলা হতো।

বেদের অভ্যন্তরীণ ৪টি ভাগ

প্রত্যেকটি বেদকে আবার অভ্যন্তরীণ গঠন অনুযায়ী ৪টি মূল অংশে ভাগ করা হয়:

  1. সংহিতা (Samhita): মূল মন্ত্র বা শ্লোকের সংকলন অংশ।
  2. ব্রাহ্মণ (Brahmana): যজ্ঞের নিয়মকানুন, ক্রিয়াকাণ্ড ও গদ্য ব্যাখ্যা।
  3. আরণ্যক (Aranyaka): অরণ্যে সাধনা বা ধ্যানচর্চার জন্য রচিত আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা।
  4. উপনিষদ (Upanishad): বৈদিক দর্শনের সর্বোচ্চ রূপ বা বেদান্ত, যেখানে আত্মজ্ঞান ও ব্রহ্মজ্ঞানের আলোচনা রয়েছে।

WBCS/UPSC স্পেশাল: চতুর্বেদের তুলনামূলক ছক

বেদ মূল বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট পুরোহিত উপবেদ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ঋগ্বেদ দেবস্তুতি, প্রার্থনাসূক্ত হোত্রী (Hotri) আয়ুর্বেদ ১০টি মণ্ডল, ১০২৮টি সূক্ত, গায়ত্রী মন্ত্র ও বর্ণপ্রথা
সামবেদ সুর, সঙ্গীত ও স্তোত্র উদ্গাতা (Udgatri) গন্ধর্ববেদ ভারতীয় সঙ্গীতের সপ্তস্বরের উৎস (১৮৭৫টি শ্লোক)
যজুর্বেদ যজ্ঞের নিয়মকানুন ও মন্ত্র অধ্বর্যু (Adhvaryu) ধনুর্বেদ গদ্য ও পদ্য উভয় রীতি; শুক্ল ও কৃষ্ণ শাখা
অথর্ববেদ চিকিৎসা, তন্ত্রমন্ত্র, জাদুবিদ্যা ব্রহ্মা (Brahma) শিল্পবেদ / স্থাপত্যবেদ আয়ুর্বেদের মূল দলিল, বেদত্রয়ীর বাইরে ছিল

বিগত বছরের পরীক্ষার প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: 'বেদত্রয়ী' বলতে কোন কোন বেদকে বোঝায়?
উত্তর: ঋগ্বেদ, সামবেদ এবং যজুর্বেদ— এই তিনটি বেদকে একত্রে 'বেদত্রয়ী' বলা হয়। অথর্ববেদ পরবর্তীকালে এর সাথে যুক্ত হয়।
প্রশ্ন ২: গায়ত্রী মন্ত্র কোন বেদে এবং কোন মণ্ডলে উল্লেখিত আছে?
উত্তর: গায়ত্রী মন্ত্র ঋগ্বেদের ৩য় মণ্ডলে উল্লেখিত রয়েছে, যা ঋষি বিশ্বামিত্র রচেছিলেন।
প্রশ্ন ৩: ভারতীয় সঙ্গীতের আদি উৎস কোন বেদ?
উত্তর: সামবেদকে ভারতীয় সঙ্গীতের আদি উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রশ্ন ৪: কোন বেদ গদ্য ও পদ্য উভয় রীতিতে রচিত?
উত্তর: যজুর্বেদ একমাত্র বেদ যা গদ্য ও পদ্য উভয় রীতিতে রচিত।
প্রশ্ন ৫: ঋগ্বেদের মন্ত্র পাঠকারী পুরোহিতকে কী বলা হতো?
উত্তর: ঋগ্বেদের মন্ত্র পাঠকারী পুরোহিতকে 'হোত্রী' (Hotri) বলা হতো।

No comments:

Post a Comment

Dont Leave Any Spam Link

Recommended for you